সঞ্চয়পত্র ক্যালকুলেটর: সহজ হিসাব ও গাইডলাইন

নিরাপদ সঞ্চয় আর নিশ্চিত আয়ের জন্য সঞ্চয়পত্রের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কোন সঞ্চয়পত্রে কত টাকা রাখলে মাস শেষে ঠিক কত টাকা হাতে পাবেন, কিংবা ট্যাক্স কাটার পর আসল মুনাফা কত দাঁড়াবে—এসব হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খান।

আপনার এই হিসাবের ঝামেলা মেটাতেই বাংলামিন্ট নিয়ে এসেছে একদম সহজ ও নির্ভুল কিছু ক্যালকুলেটর। এখন কোনো খাতা-কলম ছাড়াই নিমেষে বের করে ফেলুন আপনার কাঙ্ক্ষিত সঞ্চয়পত্রের সঠিক হিসাব!

(এখানে দেওয়া সব সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত আপডেটেড)

নিচের লিঙ্কগুলো থেকে আপনার প্রয়োজনীয় সঞ্চয়পত্রের হিসাবটি করে নিন:

১. পরিবার সঞ্চয়পত্র (FSP)

এটি ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের নারীদের জন্য ৫ বছর মেয়াদি একটি দারুণ স্কিম। প্রতি মাসে নিশ্চিত আয়ের জন্য এটি বেশ জনপ্রিয়।

  • বিনিয়োগ সীমা: শুধু একক নামে কেনা যায় এবং সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা রাখা যায়।
  • মুনাফা: সর্বোচ্চ ১১.৯৩%। মুনাফা প্রতি মাসে পাবেন, আর মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
  • কারা কিনতে পারবেন: ১৮ ঊর্ধ্ব নারী, যেকোনো শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক।

২. তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র (3MSP)

নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, এই ৩ বছর মেয়াদী স্কিমে প্রতি তিন মাস পরপর মুনাফা পাওয়া যায়।

  • বিনিয়োগ সীমা: একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা।
  • মুনাফা: সর্বোচ্চ ১১.৮২%। তিন মাস পরপর ট্যাক্স কাটার পর মুনাফা দেওয়া হয় এবং মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
  • কারা কিনতে পারবেন: সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল ও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান।

৩. পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র (BSP)

এটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য দেশের সবচেয়ে পুরনো ও জনপ্রিয় স্কিমগুলোর একটি।

  • বিনিয়োগ সীমা: একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং যৌথ নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা।
  • মুনাফা: মেয়াদ শেষে সর্বোচ্চ ১১.৮৩%। তবে এর আগে ভাঙালে মুনাফা কিছুটা কম পাবেন। মেয়াদ শেষে ট্যাক্স কেটে মুনাফাসহ মূল টাকা দেওয়া হয়।
  • কারা কিনতে পারবেন: সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল ও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান।

৪. পেনশনার সঞ্চয়পত্র (PSP)

অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য এই ৫ বছর মেয়াদী স্কিমটি তৈরি।

  • বিনিয়োগ সীমা: প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির টাকার ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত রাখা যায়।
  • মুনাফা ও কর সুবিধা: সর্বোচ্চ মুনাফা ১১.৯৮%। ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার ওপর কোনো ট্যাক্স (TDS) কাটা হয় না। ৫ লাখের বেশি হলে ১০% ট্যাক্স কাটবে।
  • কারা কিনতে পারবেন: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।

সকল ধরনের সঞ্চয়পত্র সম্পর্কে আরো জানতে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর এ যেতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

সঞ্চয়পত্র কোথা থেকে কিনব?

জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ যেকোনো তফসিলি ব্যাংক এবং দেশের সব ডাকঘর থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতে বা ভাঙাতে পারবেন। সকল ধরনের সঞ্চয়পত্র সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ভিজিট করতে পারেন।

সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ কত টাকা বিনিয়োগ করা যায়?

পরিবার, তিন মাস অন্তর ও পাঁচ বছর মেয়াদী সঞ্চয়পত্র—সব মিলিয়ে একক নামে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ আর যৌথ নামে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুযোগ আছে। ধরুন, আপনার পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৪৫ লাখ টাকা আছে, তাহলে বাকি সঞ্চয়পত্রগুলোতে আপনি আর মাত্র ৫ লাখ টাকা রাখতে পারবেন।

মুনাফার স্ল্যাব পদ্ধতিটা আসলে কী?

সহজ কথায়, সব মিলিয়ে আপনার বিনিয়োগ যদি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়, তাহলে আপনি সর্বোচ্চ রেটে মুনাফা পাবেন। এর বেশি বিনিয়োগ করলে পরের টাকার ওপর মুনাফার হার সামান্য কমে যায়।

ধরুন, পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৭.৫ লাখ টাকা বিনিয়োগে ১০% ট্যাক্স কাটার পর আপনি মাসে ৬,৭০৫ টাকা পান (১১.৯৩% রেটে)। আপনি যদি নতুন করে আরও ৭.৫ লাখ টাকা রাখেন, তাহলে ওই নতুন টাকার ওপর মুনাফা একটু কমে (১১.৮০% রেটে) মাসে ৬,৬৩৭ টাকা আসবে। তবে আপনার আগের ৬,৭০৫ টাকায় কোনো পরিবর্তন আসবে না! অর্থাৎ মাস শেষে আপনার মোট আয় হবে (৬,৭০৫ + ৬,৬৩৭) = ১৩,৩৪২ টাকা।

আপনার এই জটিল হিসাবগুলো আমাদের বাংলামিন্ট ক্যালকুলেটর এক নিমেষেই করে দেবে!

মেয়াদের আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙালে কী হবে?

মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে ভাঙালে পুরো মুনাফা পাবেন না। নিয়ম অনুযায়ী কিছু টাকা কেটে রেখে বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আর ১ বছরের আগে ভাঙালে কোনো মুনাফাই জুটবে fixনা।

যেমন: আপনি ১ লাখ টাকার ‘৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র’ কিনলেন। এক বছরে ৪ কিস্তিতে আপনি ১০,৬৩৮ টাকা মুনাফা তুলেছেন (১০% ট্যাক্স বাদে)। এখন এক বছর এক মাসের মাথায় যদি সঞ্চয়পত্রটি ভেঙে ফেলেন, তবে ওই মেয়াদের রেট (১০.৬৫%) অনুযায়ী আপনার প্রাপ্য মুনাফা দাঁড়াবে ৯,৫৮৫ টাকা। যেহেতু আপনি আগেই বেশি টাকা (১০,৬৩৮ টাকা) তুলে ফেলেছেন, তাই ওই অতিরিক্ত ১,০৫৩ টাকা আপনার মূল ১ লাখ টাকা থেকে কেটে বাকি ৯৮,৯৪৭ টাকা আপনাকে ফেরত দেওয়া হবে।

মুনাফার ওপর ট্যাক্স বা উৎস কর (TDS) কত কাটে?

মোট বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে মুনাফার ওপর ৫% ট্যাক্স কাটা হয়। ৫ লাখের বেশি হলে ১০% কাটা হয়। তবে পেনশনারদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো ট্যাক্স নেই (০%)।

মোবাইল নাম্বার কি নিজের নামেই রেজিস্ট্রেশন করা থাকতে হবে?

হ্যাঁ, নতুন সঞ্চয়পত্র কেনার সময় আপনার নিজের এনআইডি (NID) দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা মোবাইল নাম্বার অবশ্যই লাগবে। শুধু তাই নয়, আপনি যাকে নমিনি দিচ্ছেন, তার মোবাইল নাম্বারটিও অবশ্যই তার নিজের এনআইডি দিয়ে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করা থাকতে হবে।

মাঝখানে মুনাফার হার পরিবর্তন হলে কি আমার প্রাপ্ত মুনাফাও বদলে যাবে?

সরকারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৬ মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা বা আপডেট করা হয়। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, পরবর্তীতে রেট পরিবর্তন হলে কি আমার মুনাফাও কমে বা বেড়ে যাবে?
এর সহজ উত্তর হলো—না! আপনি যেদিন সঞ্চয়পত্রটি কিনেছেন, সেদিন যে মুনাফার হার ছিল, পুরো মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত আপনি ঠিক সেই হারেই মুনাফা পাবেন। পরবর্তীতে সরকার নতুন করে রেট কমালে বা বাড়ালেও আপনার কেনা সঞ্চয়পত্রে তার কোনো প্রভাব পড়বে না।

সবচেয়ে লাভজনক সঞ্চয়পত্র কোনটি?

হিসাব করলে পরিবার সঞ্চয়পত্র সবচেয়ে লাভজনক, এরপরই ভাগে ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। তবে এগুলোর মুনাফা যেহেতু আগেই দিয়ে দেওয়া হয়, মেয়াদ শেষে আপনি শুধু মূল টাকাটাই ফেরত পাবেন।

আপনার যদি প্রতি মাসে মুনাফার টাকার খুব একটা দরকার না থাকে, তাহলে সেই টাকাটা জমিয়ে মাসিক ডিপিএস (DPS) করতে পারেন। এতে মেয়াদ শেষে মূল টাকা আর ডিপিএসের মুনাফা মিলিয়ে অনেক বড় একটা ফান্ড তৈরি হবে। এভাবে দেখলে ৫ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের চেয়েও অনেক বেশি লাভ ঘরে তোলা সম্ভব!